দেশে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ মাদক ‘কুশ’। তীব্র আসক্তির এই নেশাদ্রব্য মূলত অভিজাত শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেশ আকর্ষণীয়। আশঙ্কার বিষয়, স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এর আসক্তি লক্ষ্য করা গেছে। আকাশপথ ও স্থলসীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে কুশের চালান। এর মধ্যে থাইল্যান্ড থেকে নিয়মিত কুশ আনছে ত্রিদেশীয় একটি চক্র। গত এক মাসে তাদের তিনটি চালান জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ পর্যন্ত চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং আরও তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
ডিএনসি ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী পরিচালক ড. আবু সাঈদ মিয়া সমকালকে বলেন, বিশেষ জাতের গাঁজার ফুল প্রক্রিয়াজাত করে ‘কুশ’ হিসেবে বিক্রি হয়। সাধারণ গাঁজার থেকে এর নেশার তীব্রতা অনেক বেশি। দামি এই মাদক সাধারণ তামাকের মতো সেবন করা হয়। পাশাপাশি কেক, চকলেট, চুইংগাম এবং ভেপ (ই-সিগারেট) হিসেবেও পাওয়া যায়।
ডিএনসির এ কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি দেশে কুশ নিয়ে আসছে থাইল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি চক্র। থাইল্যান্ডের ব্যাংকককেন্দ্রিক কিছু মাদক ব্যবসায়ী এগুলো সরবরাহ করছেন। তাদের কাছ থেকে কুশ ঢাকায় নিয়ে আসছেন ভারতের কয়েকজন নাগরিক। তাদের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন এদেশীয় চার-পাঁচজন। তাদের অনেককে এরই মধ্যে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত শনিবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হোসেন আবদুল কাদের শেখ নামে এক ভারতীয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছে পাওয়া যায় তিন কেজি কুশের একটি চালান। তিনি কলকাতা থেকে ব্যাংকক যান। সেখান থেকে কুশ নিয়ে ঢাকায় আসেন। ভারতের মুম্বাইয়ে তাঁর ‘সোহেল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। পাশাপাশি পোশাক ব্যবসাও করেন। তিনি প্রায়ই থাইল্যান্ড ও চীনে যাতায়াত করেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি কেজি কুশের দাম প্রায় ২০ লাখ টাকা। এর আগে ১৮ আগস্ট বিমানবন্দরে ৪ কেজি ১০০ গ্রাম কুশ জব্দ করা হয়। ওই চালানটি আনেন ভারতীয় নাগরিক আকাশ দুবে ও আকাশ পাণ্ডে। তবে চালান জব্দের প্রক্রিয়া বুঝতে পেরে তারা বিমানবন্দর থেকে পালিয়ে যান। এখনও তারা বাংলাদেশে আছেন বলে জানা গেছে। এ চক্রের আরেক সদস্য জুলফিকার মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয় গত ২৪ জুলাই। তাঁর কাছে পাওয়া যায় ১১ কেজি ৮০০ গ্রাম কুশ। জুলফিকারের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন তাঁর চাচাতো ভাই আকরাম মোল্লা। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, তিনটি চালানের সঙ্গে পাঁচ ভারতীয় নাগরিকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের সহযোগী হিসেবে এদেশের চার-পাঁচজন আছেন, এমন আভাসও পাওয়া গেছে। কারণ ভারতীয় নাগরিকরা ঢাকায় চালান হস্তান্তর করেই ফিরে যান। এরপর দেশের ভেতরে কুশ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করেন চক্রের এদেশীয় সদস্যরা। এমনকি ভারতীয়দের এখানে থাকার ব্যবস্থা, ধরা পড়লে আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও তারা করেন। এর আগে গত ৬ আগস্ট বিজিবি সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে ১২ কেজি কুশসহ মো. তারিকুজ্জামান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। চালানটি ভারতে যাচ্ছিল বলে ওই সময় জানান বিজিবির কর্মকর্তারা।
স্কুলছাত্র কুশে আসক্ত, কিনে দেন চিকিৎসক মা ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, স্কুলপড়ুয়া কেউ কেউ কুশে আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাতে গিয়ে এমন তথ্য তারা পেয়েছেন। এ ছাড়া গত ২৬ মে শাহজালাল বিমানবন্দরে এক নারী চিকিৎসক ও তাঁর ইংরেজ মাধ্যম স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। তাদের কাছে পাওয়া যায় ৫৯টি ইলেকট্রিক ভেপ। সেগুলোর মধ্যে ছিল কুশের মূল উপাদান টেট্রাহাইড্রো ক্যানাবিনল-টিএইচসি। জিজ্ঞাসাবাদে ওই চিকিৎসক জানান, ছেলে ভেপের আবদার করেছিল। তাই তাকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে এগুলো কিনে দিয়েছেন। ছেলের বাবাও একজন চিকিৎসক।
দেশেই উৎপাদনের চেষ্টা অনেক দেশেই কুশের (গাঁজা) চাষ নিষিদ্ধ হওয়ায় এখন ঘরের ভেতর কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। দেশেও এমন উদ্যোগ ধরা পড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকার ওয়ারীতে কুশ উৎপাদন ও সংরক্ষণের পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি পাওয়া যায়। জানা যায়, প্রবাসী তৌসিফ হাসান বিদেশে থেকে প্রযুক্তির সহায়তা ও সহযোগীদের মাধ্যমে দেশে নিজের বাসায় কুশ উৎপাদনের ল্যাব তৈরি করেন। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে দেশে প্রথমবার কুশ জব্দের কথা জানায় র্যাব। তখন বলা হয়, ওনাইসী সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদ নামে একজন বিদেশ থেকে ফিরে মাদক নিয়ে গবেষণা করছিলেন।