বাংলাদেশের অর্থনীতির কাটিয়ে ওঠা পুরোনো সমস্যাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আবার নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘায়িত ও অনিশ্চিত এই যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। পণ্য পরিবহনের গতিপথেও তৈরি হয়েছে বাড়তি ঝুঁকি। ফলে সমুদ্রপথে জাহাজীকরণ ব্যয় বেড়েছে, বাড়ছে আমদানি খরচও। এর সবচেয়ে বড় চাপ এখন জ্বালানি খাতে। তেল ও এলএনজি নিয়ে দেশে দীর্ঘদিনের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
জ্বালানিসংকটের এই ধাক্কা এখন শুধু জ্বালানি খাতে থেমে নেই। গ্যাসের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন, কোথাও কমছে কাজের সময়, আবার কোথাও বন্ধ হচ্ছে কারখানা। কমছে সার উৎপাদন। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বাড়ছে চাপ, বাড়ছে লোডশেডিং ও জ্বালানি ব্যয়। এর সঙ্গে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ায় বাড়ছে পণ্যের দামও। এসবই মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে মানুষের আয়রোজগার ও কর্মসংস্থানে।
সার্বিক পরিস্থিতি অনুমান করে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, এই সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। একই কারণে দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার সুযোগ হারাতে পারে আরও ১২ লাখ মানুষ। চলতি বছরের জুনের মাঝামাঝি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বাজেট সহায়তা প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংক এই আশঙ্কামূলক মূল্যায়ন করেছিল।
এর আগে খোদ বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে চলতি বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসবে—এমন পূর্বাভাস ছিল। কিন্তু জুনের মূল্যায়ন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সেই সংখ্যা নেমে আসতে পারে ৫ লাখে। অর্থাৎ যুদ্ধের ধাক্কায় দারিদ্র্য কমানোর সম্ভাব্য অগ্রগতির বড় অংশ এখন থেমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার পুরোনো দুর্বলতা এই আশঙ্কাকে আরও বড় করে তুলেছে। দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। অথচ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। ঘাটতি মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০-৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫-৬০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ মানে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে বাড়তি অনিশ্চয়তা। এরই মধ্যে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪-২৮ ডলারে উঠেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সেপ্টেম্বরের জন্য কেনা দুটি এলএনজি কার্গোর দামও প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ ডলারের বেশি পড়েছে।
জ্বালানির এই বাড়তি খরচের সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকারের ভর্তুকির চাপ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বোঝা ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যা ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে অন্য খাতের বরাদ্দেও চাপ নিতে হতে পারে।
কৃষিতেও এর প্রভাব পড়ছে। ইউরিয়া উৎপাদনে গ্যাস দরকার; আবার ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির মতো সারের জন্য বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর। গ্যাস-সংকটে দেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার পাঁচটিতে উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।
শিল্পের অবস্থাও স্বস্তির নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মাসে গড়ে ২৬ বার বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ে। এতে বছরে বিক্রির প্রায় ৯ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটের সঙ্গে বাড়তি আমদানি ব্যয় যোগ হওয়ায় উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে। কোথাও কাজের সময় কমছে, কোথাও উৎপাদন কমছে, আবার কিছু কারখানা বন্ধও হচ্ছে।
সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, গ্যাস না পাওয়ায় শিল্পকারখানায় নতুন করে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না; কোথাও কাজের সময় কমেছে, আবার জ্বালানিসংকটে কিছু কারখানা বন্ধও হয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্বব্যাংকের কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কার কিছু লক্ষণ ইতিমধ্যে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে।