তাঁবুতে অবস্থান করছেন ভূমিকম্পে বাস্তুচ্যুতরা
ইন্দোনেশিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ সোমবার (১৭ আগস্ট) জরুরি সহায়তার অপেক্ষায় স্কুল, পুলিশ স্টেশন ও সরকারি দফতরে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে খোলা আকাশের নিচেও রয়েছেন।
গত শনিবার ভোরের শক্তিশালী ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। উদ্ধার কর্মকর্তারা জানায়, এখন পর্যন্ত কেউ নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া যায়নি।
ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের উত্তর উপকূলে অবস্থিত ছোট শহর এমবে থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
তবে সোমবার সকাল পর্যন্ত বাড়িঘরে ফিরতে না পারা মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১২ হাজার ৮০০-তে দাঁড়িয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (বিএনপিবি) জানিয়েছে, ফ্লোরেস দ্বীপের কয়েকটি শহরে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন।
ভূমিকম্পের পর কয়েক শত পরাঘাত অনুভূত হওয়ায় ফ্লোরেসের বহু বাসিন্দা টানা দ্বিতীয় রাতও বাড়ির বাইরে কাটিয়েছেন। তারা বাড়িতে ফিরতে তারা ভয় পাচ্ছেন।
এএফপি ফ্লোরেসের কেন্দ্রস্থলের সবচেয়ে কাছের নাজেকেও রিজেন্সির ছোট শহর এমবেতে কয়েকজন বাসিন্দাকে ত্রিপল ও খুঁটি দিয়ে বানানো অস্থায়ী তাঁবুতে অবস্থান করতে দেখেছে।
এমবের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী জুনাইদিন বলেন, ‘আমাদের বাড়িগুলো আর বসবাসের উপযোগী নেই। অনেক বাড়ি ধসে পড়েছে এবং দেয়ালে বড় বড় ফাটল ধরেছে। তাই আমরা আর ভেতরে ঢুকতে পারছি না।’
নিজ হাতে তৈরি ওই তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, সেখানে প্রায় ৩০ জন ঘুমাচ্ছেন। ‘আমরা শুধু পানি, কাপড় ও বালিশ নিতে বাড়িতে যাই। এরপর রাতটা এখানেই কাটাই।’
১৯৯২ সালে ফ্লোরেসে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের ভয়াবহ স্মৃতি অনেক বাসিন্দার মনে এখনো রয়েছে। ওই ভূমিকম্পের পর সুনামি আঘাত হানে। এতে প্রায় দুই হাজার ৫০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
জুনাইদিন বলেন, ‘এখানে আমরা নিজেদের মতোই আছি।’
রাজধানী জাকার্তায় জাঁকজমকের সাথে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সময় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জুনাইদিন বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে এখনো কোনো সহায়তা পাইনি। তাঁবু নেই, ওষুধ নেই, খাবার নেই, পান করার পানি নেই—কিছুই নেই।’
‘আমরা কিছুই সাথে নিতে পারিনি’ইন্দোনেশিয়ার বিমানবাহিনী জানিয়েছে, দু’টি হারকিউলিস পরিবহন বিমান ও একটি বোয়িং বিমানে করে ১৩ টন জরুরি ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা আন্তারা জানিয়েছে, কুপাংয়ের এল তারি বিমানঘাঁটির কমান্ডার বলেছেন, বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে সরাসরি জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দিতে হেলিকপ্টারও মোতায়েন করা হচ্ছে।
ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে খাবার, পোশাক, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম।
প্রধান প্রধান কেন্দ্রে ত্রাণ বিতরণে সহায়তার জন্য সামরিক সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
ভূতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অগভীর ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ফ্লোরেসের উত্তর উপকূলের অদূরে।
দুর্গত এলাকাগুলোতে উঁচু ভবন খুব কম, কোথাও নেই বললেই চলে।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র বার্টন সুয়ার পেলিতা পানজাইতান বলেন, দ্বীপটিতে কমপক্ষে ৯১৪টি বাড়ি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরো কয়েক শত বাড়ি কম মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি দফতরের কয়েক ডজন ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এনজিও সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর আট হাজারের বেশি শিশু ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি ও শিক্ষাজীবনে ব্যাঘাতের’ মুখে পড়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’-এ ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান। জাপান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এই এলাকায় তীব্র ভূমিকম্পের প্রবণতা রয়েছে। এ কারণে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্প হয়।
২০০৪ সালে সুমাত্রার উপকূলের কাছে ৯ দশমিক ১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর ফলে সৃষ্ট সুনামিতে পুরো অঞ্চলজুড়ে দুই লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়াতেই প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার মানুষ মারা যান।
রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
সূত্র: বাসস