ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩
চাটখিল ভয়েস

দৈনিক আড়াই ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বাড়ে বিষণ্নতা: গবেষণা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো বিষণ্নতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস হতে পারে। এমনকি চাকরি, শিক্ষাগত পটভূমি কিংবা ভিডিও গেম খেলা, ইন্টারনেট ব্যবহার বা টেলিভিশন দেখার মতো অন্যান্য কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা সময়ের চেয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে বিষণ্নতার সম্পর্ক বেশি শক্তিশালী বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আড়াই ঘণ্টা বা ১৫০ মিনিট সময় কাটানো শুরু করলে মানুষের নিজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিষণ্নতার সঙ্গে একটি সম্পর্ক দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটি এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া বার্ষিক ‘মিডিয়া বিহ্যাভিয়ারস অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স স্টাডির’ ১১ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এতে দেখা গেছে, নিজের সম্পর্কে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিষণ্নতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার। গবেষণাটির সংশ্লিষ্ট লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির অধ্যাপক হ্যান্স ব্রেইটার বলেন, বিষণ্নতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে গত ১১ বছরের বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোতে বারবার একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটি একটি ভয়াবহ চিত্র। জীবনের সব পর্যায়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের এমন কোনো পণ্যের কাছে নিজেদের সমর্পণ করা উচিত নয়, যেটি আমাদের দেখার সময় বাড়ানোর জন্য আসক্তি তৈরির বিজ্ঞান ব্যবহার করে।’ গবেষণাটি এনপিজে মেন্টাল হেলথ রিসার্চ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির গবেষকেরা নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কো-লিড লেখক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক মার্টিন ব্লকের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে বিষণ্নতাসহ বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে এর আগে বহু গবেষণা হয়েছে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও এই সম্পর্ক একইভাবে টিকে থাকে কি না, তা দেখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে গবেষণা করার নজির ছিল না। গবেষকেরা ‘মিডিয়া বিহ্যাভিয়ারস অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স স্টাডির’ ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩০০টি বেনামি জরিপ বিশ্লেষণ করেন। এসব জরিপে ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্করা অংশ নিয়েছিলেন। প্রসপার ইনসাইটস অ্যান্ড অ্যানালিটিকস নামক একটি প্রতিষ্ঠান ২০০২ সাল থেকে প্রতি বছর এই জরিপ পরিচালনা করছে। জরিপটিতে বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১ হাজার ৩১৮টি প্রশ্ন থাকে। অংশগ্রহণকারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের ৩১টি সূচকও এতে পরিমাপ করা হয়, যার মধ্যে নিজের সম্পর্কে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিষণ্নতার বিষয়টিও রয়েছে। গবেষকেরা এমন একটি মেশিন-লার্নিং মডেল ব্যবহার করেন, যার নির্ভুলতা ও ফলাফলের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করার জন্য বিশেষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছিল। এই মডেলের মাধ্যমে তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে বিষণ্নতার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক খুঁজে পান। গবেষণার কো-লিড লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির গবেষণা সহযোগী বিক্রম সুরেশ বলেন, প্রকাশিত গবেষণার বড় একটি অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী, একক ডেটাসেট অথবা সামগ্রিকভাবে স্ক্রিনে কাটানো সময়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অন্যান্য ডিজিটাল কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা করে দেখার মতো আরও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও বিভিন্ন বছরে একই ধরনের সম্পর্ক দেখা যায় কি না, সেটিও পরীক্ষা করা দরকার। গবেষকেরা দেখতে পান, প্রতিদিন অন্তত ১৫০ মিনিট বা আড়াই ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা ব্যক্তিদের মধ্যে নিজের সম্পর্কে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিষণ্নতার সঙ্গে একটি সম্পর্ক দেখা যায়। গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ১১ বছরের প্রতিটি বছরেই একই ফল পাওয়া গেছে। হ্যান্স ব্রেইটার বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য ও সুখের সঙ্গে পৃথিবীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা এবং জীবনে কোনো উদ্দেশ্য থাকা সম্পর্কিত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিষ্ক্রিয়ভাবে কোনো কিছু দেখে যাওয়ার সঙ্গে নয়। ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির ডক্টরাল শিক্ষার্থী ও গবেষণার সহলেখক জনাথান অ্যাভান্ট বলেন, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মানুষ অনেক দিন ধরেই সন্দেহ করে আসছে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই এমন অনেক প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে মানুষ নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে কথা বলে। গবেষকেরা আরও দেখতে পেয়েছেন, ১১ বছরের গবেষণা সময়জুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ধীরে ধীরে বিষণ্নতার আরও শক্তিশালী পূর্বাভাসে পরিণত হয়েছে। এক পর্যায়ে টেলিভিশন দেখা বা ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের মতো অনেক অন্যান্য কারণকেও এটি ছাড়িয়ে যায়। ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ও গবেষণার সহলেখক নিকোল ভাইকে বলেন, বছরের পর বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ধরন বদলে গেছে। তিনি বলেন, শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল পরিচিত মানুষদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের একটি মাধ্যম। এখন মানুষ সাধারণত এমন ব্যক্তিদের তৈরি কনটেন্টও দেখে, যাদের তারা চেনে না। ভাইকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কতটা আসক্তিকর হয়ে উঠতে পারে, তা অবাক করার মতো। তিনি বিশেষ করে দীর্ঘ সময় অনলাইনে থাকা কনটেন্ট নির্মাতাদের উদাহরণ দেন। তার মতে, এসব নির্মাতাকে অনেক সময় নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনলাইন থেকে কয়েক মাসের বিরতিও নিতে হয়। বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের এই শিল্প মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ও সহলেখক সুমার বারি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটানো সময় কমানোর কিছু উপায় রয়েছে। যেমন, ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করে টাইমার চালু করা, নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং প্রতিবার ব্যবহার শেষে অ্যাকাউন্ট থেকে পুরোপুরি লগ-আউট করা। এতে অভ্যাসবশত আবার ঢুকে স্ক্রল করা কিছুটা কঠিন হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া সবার জন্য বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। বারি বলেন, সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত থাকার এবং অনলাইনে সক্রিয় থাকার জন্য মানুষের ওপর অনেক সামাজিক চাপ রয়েছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। মার্টিন ব্লক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের সময়ের সংস্কৃতির একটি সাধারণ চিহ্ন হয়ে উঠেছে, যেমন এক শতাব্দীরও বেশি আগে গাড়ি হয়ে উঠেছিল। তবে তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে বিষণ্নতার যে সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। তিনি গাড়ির সঙ্গে যেমন সড়ক দুর্ঘটনা ও দূষণের সম্পর্ক রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও বিষণ্নতার সঙ্গে এর সম্পর্ককে তেমনভাবে দেখেছেন। গবেষণার ফলাফল নিয়ে ব্রেইটার বলেন, গভীরভাবে অনলাইননির্ভর হয়ে ওঠা বর্তমান সংস্কৃতির ক্ষতি কমানোর উপায় খুঁজে বের করা সমাজের স্বার্থেই জরুরি। তাঁর ভাষায়, ‘এটি একটি সতর্কবার্তা।’

দৈনিক আড়াই ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বাড়ে বিষণ্নতা: গবেষণা