প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা মানুষের নিত্য অভ্যাস। শিশু থেকে বয়স্ক– সব বয়সী মানুষের ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় টুথপেস্ট নিয়ে এবার উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টের প্রায় চারটির মধ্যে তিনটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের নয়, শিশুদের জন্য বাজারজাত টুথপেস্টেও মিলেছে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) এক বছরের গবেষণায় বাজারের ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছে, এর মধ্যে ২৬টিতে, অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
রোববার রাজধানীর লালমাটিয়ায় এসডোর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন টুথপেস্ট’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। সংস্থাটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশে বাজারজাত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা। গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে লক্ষ্যবস্তু করা নয়; বরং ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে ব্যবহারযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যভান্ডার তৈরি করা।
এক বছরে সংগ্রহ ও পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে গত জুন পর্যন্ত। এই সময় দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে স্থানীয় ও আমদানি করা ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই) গবেষণাগারে এসব নমুনার বিশ্লেষণ করা হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার দুই হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর চালানো হয় একটি জরিপ।
পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫ নমুনার মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা দুটি নমুনার দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে। থাইল্যান্ডের দুটি নমুনার একটিতে এবং ভারতের পাঁচটি নমুনার একটিতে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
কোন টুথপেস্টে সবচেয়ে বেশি গবেষণায় সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেল টুথপেস্টে। প্রতি ১০০ গ্রামে এতে ৩২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশে ১৬০টি করে, কোদোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলায় ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিন টিতে ১২০টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট ও হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ারে ১০০টি করে এবং সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টে ৮০টি কণা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্ট, হোয়াইট প্লাস রেড, হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ জেল, মেরিল বেবি স্ট্রবেরি, সিগন্যাল হোয়াইটেনিং ও মেডিপ্লাস টিজিপি ফর্মুলা টুথপেস্টে ৬০টি করে কণা শনাক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে এএমপিএম হার্বাল, মেডিপ্লাস ডিএস, পেপসোডেন্ট জার্মিচেক+, মেরিল বেবি অরেঞ্জ, ম্যাজিক হারবাল, মেসওয়াক ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ স্যাশেতে ৪০টি করে কণা পাওয়া গেছে। ডেন্টিন জেল, পেপসোডেন্ট কিডস অরেঞ্জ, ক্লোজআপ লেমন সি সল্ট, ব্রাশআপ হোয়াইটেনিং জেল এবং হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভে পাওয়া গেছে ২০টি করে কণা।
মাইক্রোপ্লাস্টিক মেলেনি আটটিতে গবেষণায় আটটি টুথপেস্টে কোনো শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এগুলো হলো জেনফ্রেশ, প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো), ক্লোজআপ রেড-হট জিংক ফ্রেশ টেকনোলজি, প্যারোডনট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার, সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল, কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ, কোলগেট অ্যাক্টিভ সল্ট এবং কোদোমো অরেঞ্জ।
শিশুদের টুথপেস্টও মুক্ত নয় শিশুদের জন্য বাজারজাত করা ছয়টি টুথপেস্টও গবেষণার আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে চারটিতে অর্থাৎ, প্রায় ৬৭ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এসব টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত কণা শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ১৪০টি কণা পাওয়া যায় কোদোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলায়। মেরিল বেবি স্ট্রবেরিতে পাওয়া গেছে ৬০টি, মেরিল বেবি অরেঞ্জে ৪০টি এবং পেপসোডেন্ট কিডস অরেঞ্জে ২০টি কণা। তবে প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি ও কোদোমো অরেঞ্জে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।
মোড়কে নেই কোনো তথ্য গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়কে মাইক্রোপ্লাস্টিক কিংবা ব্যবহৃত সিনথেটিক পলিমারের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। এসডো বলছে, এর ফলে ভোক্তারা সচেতনভাবে পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্যও বাজার তদারকি কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংবাদ সম্মেলনে এসডোর মহাসচিব ও সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, গবেষণায় ব্যবহৃত সব নমুনা সরাসরি সুপারশপ, খুচরা বিক্রেতা ও বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে নকল বা ভেজাল পণ্য গবেষণার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না। তিনি বলেন, প্রতিদিন ব্যবহৃত একটি পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে এ বিষয়টি অধিকাংশ ভোক্তারই অজানা। তাই টুথপেস্টের উপাদান লেবেলে উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার করা জরুরি।
ভোক্তাদের সচেতনতা সীমিত গবেষণার অংশ হিসেবে পরিচালিত ভোক্তা জরিপে দেখা গেছে, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও খুবই সীমিত। জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা আগে কখনও এ বিষয়ে শোনেননি। ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন, শুনেছেন তবে বিস্তারিত জানেন না। মাত্র ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে সচেতন। জরিপে আরও দেখা গেছে, ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা নিয়মিত টুথপেস্ট ব্যবহার করেন এবং ৯০ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়মিত টুথব্রাশ ব্যবহার করেন। ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ দিনে একবার এবং ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করেন।
টুথপেস্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে উঠে এসেছে মেডিপ্লাস। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা এই ব্র্যান্ড ব্যবহার করেন। এর পর রয়েছে ক্লোজআপ ও পেপসোডেন্ট, যেগুলো ব্যবহার করেন ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ করে উত্তরদাতা। কোলগেট ব্যবহার করেন ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।
মান সংশোধনের উদ্যোগ নেবে বিএসটিআই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) উপপরিচালক (রসায়ন) মো. মনজুরুল করিম বলেন, বর্তমানে টুথপেস্টের জাতীয় মানে ৪০টি অনুমোদিত উপাদান এবং কণার আকারের সীমা নির্ধারণ রয়েছে। কিছু উৎপাদক কম খরচে ওজন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করতে পারেন, যা একটি খারাপ চর্চা। তিনি জানান, ২০১৯ সাল থেকেই প্রসাধনী পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের বিষয়টি বিএসটিআইয়ের নজরে রয়েছে। ইতোমধ্যে ফেসওয়াশ ও ফেসপ্যাকের মান সংশোধন করা হয়েছে। এখন টুথপেস্টের মানেও একই ধরনের সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
নীতিমালা নেই, বাধ্যতামূলক নয় পরীক্ষা এসডো বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য কোনো জাতীয় মানদণ্ড, অনুমোদিত সীমা, পরীক্ষার পদ্ধতি কিংবা বাধ্যতামূলক লেবেলিং নীতি নেই। ফলে উৎপাদকরা এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশে বাধ্য নন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থারও কার্যকর নজরদারির সুযোগ সীমিত।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান সৈয়দ মারগুব মোরশেদ বলেন, বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতেই কার্যকর জননীতি প্রণয়ন করা উচিত। এই গবেষণা টুথপেস্টের মানদণ্ড উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা জোরদার এবং ভোক্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশে সম্ভাব্য ঝুঁকি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাঁত ব্রাশের সময় টুথপেস্টের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্জ্য পানির মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা নদী, জলাশয় ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানবদেহেও প্রবেশের শঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শের সঙ্গে শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, হৃদরোগ, স্নায়ুতন্ত্র ও প্রজননস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এসব প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার ফল প্রকাশের পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শুধু ভোক্তার স্বাস্থ্য নয়, পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তাই দ্রুত জাতীয় মানদণ্ড প্রণয়ন, বাধ্যতামূলক লেবেলিং, নিয়মিত পরীক্ষাগার তদারকি এবং উৎপাদকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, এই গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক শূন্যতা পূরণ হয়েছে। এর ফলাফল ভবিষ্যতে ওরাল কেয়ার পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানদণ্ড নির্ধারণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়নে সহায়ক হবে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক লাইন ডিরেক্টর দন্ত চিকিৎসক অধ্যাপক মো. মোশাররফ হোসেন খন্দকার বলেন, মুখ পরিষ্কারে ব্যবহৃত পণ্যগুলোতে এ ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থাকা উচিত নয়। দাঁতের সুরক্ষায় ফ্লোরাইড, কার্বনেট ও সিলিকাকে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মনে করা হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক তার ঘর্ষণ ক্ষমতার কারণে দাঁত সাদা করতে পারলেও, এটি দাঁতের এনামেলের ওপর বিরূপ ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহমুদা তামান্না খান বলেন, গবেষণায় যে বিষয়টি উন্মোচিত করেছি, এর ওপর ভিত্তি করে আমরা কাজ করতে আগ্রহী। বিএসটিআইকে সব ধরনের সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত। সরকারি সংস্থা ও এনজিওগুলো একযোগে কাজ করলেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
আপনার মতামত লিখুন